১৯০৮ সালের তামাদি আইন (Limitation Act
১৯০৮ সালের তামাদি আইন (Limitation Act) একটি পদ্ধতিগত আইন (Procedural Law), যা নির্ধারণ করে কোনো মামলার প্রতিকার পাওয়ার জন্য কত সময়ের মধ্যে আদালতে যেতে হবে। এই আইনের মূল কথা হলো—আইন তাকেই সাহায্য করে যে সচেতন, তাকে নয় যে নিজের অধিকারের ওপর ঘুমিয়ে থাকে।
তামাদি আইনের ১ থেকে ৩২টি ধারা রয়েছে (যদিও অনেকগুলো বর্তমানে বাতিল)। নিচে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর ১-২ লাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
প্রাথমিক ও সাধারণ বিষয় (ধারা ১-৫)
ধারা ১: আইনের নাম, প্রয়োগ ও শুরুর তারিখ।
ধারা ৩: তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মামলা, আপিল বা দরখাস্ত দায়ের করলে আদালত তা খারিজ করে দেবেন (বিবাদী পক্ষ আপত্তি না তুললেও)।
ধারা ৪: তামাদির শেষ দিনে যদি আদালত বন্ধ থাকে, তবে যেদিন আদালত খুলবে সেদিনই মামলা বা আপিল দায়ের করা যাবে।
ধারা ৫: উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে আপিল বা দরখাস্ত দায়েরের বিলম্ব আদালত মকুব করতে পারেন (তবে মূল দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়)।
আইনি অক্ষমতা (ধারা ৬-৯)
ধারা ৬: নাবালক, পাগল বা জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি সুস্থ বা সাবালক হওয়ার পর থেকে তামাদির মেয়াদ গণনা শুরু হবে।
ধারা ৭: একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কেউ যদি আইনি অক্ষমতার শিকার হন (যেমন: ৩ ভাইয়ের মধ্যে একজন নাবালক), তবে তার সাবালক হওয়া পর্যন্ত তামাদি স্থগিত থাকতে পারে।
ধারা ৮: ধারা ৬ ও ৭-এর সুবিধা সর্বোচ্চ ৩ বছরের বেশি পাওয়া যাবে না এবং অগ্রক্রয় (Pre-emption) মামলার ক্ষেত্রে এই সুবিধা খাটে না।
ধারা ৯: একবার তামাদির সময় চলা শুরু হলে, পরবর্তী কোনো অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতা তা থামাতে পারে না।
ট্রাস্টি ও বিশেষ ক্ষেত্র (ধারা ১০-১১)
ধারা ১০: কোনো ট্রাস্টি বা তার প্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিশ্বাসের খেলাপের মামলায় তামাদির কোনো সময়সীমা নেই (যেকোনো সময় মামলা করা যায়)।
ধারা ১১: বিদেশে সম্পাদিত চুক্তির ওপর বাংলাদেশে মামলা করলে বাংলাদেশের তামাদি আইন কার্যকর হবে।
সময় গণনা পদ্ধতি (ধারা ১২-১৬)
ধারা ১২: তামাদির সময় গণনার সময় যে দিন থেকে মেয়াদ শুরু, রায়ের নকল নিতে যে সময় লেগেছে এবং ডিক্রির নকল নেওয়ার সময় বাদ দিতে হবে।
ধারা ১৩: আসামী বা বিবাদী যত দিন বাংলাদেশের বাইরে থাকবেন, তত দিন তামাদির সময় থেকে বাদ যাবে।
ধারা ১৪: ভুল আদালতে সরল বিশ্বাসে মামলা করে যে সময় নষ্ট হয়েছে, নতুন করে সঠিক আদালতে মামলা করার সময় ওই সময়টুকু বাদ যাবে।
ধারা ১৫: কোনো মামলা যদি আদালতের ইনজাংশন (নিষেধাজ্ঞা) বা আদেশের কারণে স্থগিত থাকে, তবে ওই স্থগিতকাল তামাদি থেকে বাদ যাবে।
ধারা ১৬: নিলাম বিক্রয় রদের মামলা চলাকালীন সময়টুকু তামাদি গণনা থেকে বাদ যাবে।
প্রতারণা ও লিখিত প্রাপ্তিস্বীকার (ধারা ১৭-২০)
ধারা ১৭: মামলা করার অধিকার পাওয়ার আগেই যদি কোনো ব্যক্তি মারা যান, তবে তার বৈধ প্রতিনিধি না আসা পর্যন্ত তামাদি শুরু হবে না।
ধারা ১৮: বিবাদী যদি প্রতারণার মাধ্যমে বাদীকে মামলার কারণ জানতে বাধা দেয়, তবে প্রতারণা ধরা পড়ার পর থেকে তামাদি শুরু হবে।
ধারা ১৯: তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিবাদী যদি লিখিতভাবে দেনা বা অধিকার স্বীকার করে স্বাক্ষর করেন, তবে ওই স্বাক্ষরের দিন থেকে নতুন করে তামাদি শুরু হবে।
ধারা ২০: ঋণের সুদ বা আংশিক কিস্তি পরিশোধ করলে, ওই পরিশোধের সময় থেকে নতুন করে তামাদি গণনা শুরু হবে।
অন্যান্য বিধান (ধারা ২১-৩২)
ধারা ২২: মামলায় নতুন কোনো বাদী বা বিবাদী যোগ করলে, তাদের জন্য যোগ করার দিন থেকেই মামলা শুরু হয়েছে বলে গণ্য হবে।
ধারা ২৩: অবিরাম চুক্তি ভঙ্গ (Continuing Breach) বা অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তেই নতুন করে তামাদির মেয়াদ শুরু হয়।
ধারা ২৪: যে কাজের ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না, বরং পরে প্রকাশ পায়, সেই ক্ষতির সময় থেকে তামাদি শুরু হবে।
ধারা ২৫: তামাদি আইনের সকল সময় ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গণনা করা হবে।
ধারা ২৬ (সুখাধিকার/Easement): সরকারি জমিতে ৬০ বছর এবং ব্যক্তিগত জমিতে ২০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কোনো রাস্তা, আলো বা বাতাস ব্যবহার করলে সেখানে আইনগত অধিকার (Easement Right) তৈরি হয়।
ধারা ২৭: ইজমেন্ট অধিকারের ক্ষেত্রে জীবনসত্ব বা নির্দিষ্ট মেয়াদের ভোগকাল বাদ দেওয়ার নিয়ম।
ধারা ২৮: তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মালিকানার অধিকারও বিলুপ্ত হয় (এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা)।
তামাদি আইনের তফসিল (Schedule):
তামাদি আইনের সাথে একটি বিশাল তফসিল রয়েছে যেখানে কোন মামলার জন্য কত দিন বা কত বছর সময় পাওয়া যাবে তা বলা আছে। যেমন:
খাজনা আদায়ের মামলা: ৩ বছর।
চুক্তি প্রবলের মামলা (Specific Performance): ১ বছর।
স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার: ১২ বছর।
সরকারের বিরুদ্ধে মামলা: ৬০ বছর।
আপনার কি কোনো নির্দিষ্ট ধরণের মামলার (যেমন: জমি জমা বা টাকা ধার) তামাদির মেয়াদ সম্পর্কে জানার প্রয়োজন আছে?
Comments
Post a Comment