সাক্ষ্য আইনের ১০১ থেকে ১৫০ ধারা
সাক্ষ্য আইনের ১০১ থেকে ১৫০ ধারা পর্যন্ত মূলত 'প্রমাণের দায়ভার' (Burden of Proof) এবং 'বিবন্ধ' (Estoppel) সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর ১-২ লাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof)
ধারা ১০১: যে ব্যক্তি আদালতের কাছে কোনো রায় চায়, সেই ঘটনাটি প্রমাণের দায়িত্ব ওই ব্যক্তির নিজের।
ধারা ১০২: মামলায় কোনো পক্ষই যদি সাক্ষ্য না দেয় তবে যে পক্ষ হেরে যাবে, সাক্ষ্য দেওয়ার দায়িত্ব মূলত তার।
ধারা ১০৩: কোনো বিশেষ ঘটনা (যেমন: আলিবাই) প্রমাণ করতে চাইলে সেই পক্ষকেই তা প্রমাণ করতে হবে।
ধারা ১০৪: সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য করার জন্য যদি কোনো প্রাথমিক ঘটনা প্রমাণের প্রয়োজন হয়, তবে তা প্রমাণের দায়িত্ব ওই পক্ষের।
ধারা ১০৫: আসামী যদি নিজেকে দণ্ডবিধির সাধারণ ব্যতিক্রমের (যেমন: আত্মরক্ষা) আওতায় দাবি করে, তবে তা প্রমাণের দায়িত্ব আসামীর।
ধারা ১০৬: কোনো বিষয় যদি কেবল একজনের বিশেষ জ্ঞানে থাকে, তবে সেটি প্রমাণের দায়িত্ব তার নিজের।
ধারা ১০৭: ৩০ বছরের মধ্যে কেউ জীবিত ছিল জানলে, সে মারা গেছে এটা প্রমাণের দায়িত্ব যে ব্যক্তি দাবি করছে তার।
ধারা ১০৮: ৭ বছর ধরে কেউ নিখোঁজ থাকলে সে জীবিত আছে—এটি প্রমাণের দায়িত্ব যে দাবি করছে তার।
ধারা ১০৯: অংশীদার, মালিক-ভৃত্য বা বাড়িওয়ালা-ভাড়ারটিয়ার সম্পর্ক নেই বলে দাবি করলে তা প্রমাণের দায়িত্ব ওই ব্যক্তির।
ধারা ১১০: কেউ কোনো জিনিসের দখলে থাকলে সে-ই মালিক; যদি অন্য কেউ নিজেকে মালিক দাবি করে তবে তাকেই তা প্রমাণ করতে হবে।
ধারা ১১১: বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্কের ক্ষেত্রে (যেমন: উকিল-মক্কেল) কোনো লেনদেন হলে তা সরল বিশ্বাসে হয়েছে কি না তা প্রমাণের দায়িত্ব প্রভাবশালী ব্যক্তির।
ধারা ১১২: বৈধ বিবাহ চলাকালীন জন্ম নেওয়া সন্তান বৈধ; এটি খণ্ডন করতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের সুযোগ ছিল না।
ধারা ১১৩: কোনো অঞ্চল হস্তান্তরের সরকারি ঘোষণা সেই হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রমাণ।
ধারা ১১৪: আদালত কিছু ঘটনার স্বাভাবিক গতি অনুযায়ী কিছু বিষয় সত্য বলে ধরে নিতে পারেন (Presumption)।
বিবন্ধ (Estoppel)
ধারা ১১৫: একবার কোনো কথা বা কাজ দিয়ে কাউকে বিশ্বাস করালে, পরে তা অস্বীকার করে অন্যপক্ষের ক্ষতি করা যাবে না।
ধারা ১১৬: ভাড়াটিয়া কখনো তার বাড়িওয়ালার মালিকানা বা স্বত্ব অস্বীকার করতে পারবে না।
ধারা ১১৭: বিনিময় বিল গ্রহণকারী বা লাইসেন্সধারী ব্যক্তি তার মূল মালিকের অধিকার অস্বীকার করতে পারবে না।
সাক্ষী ও সাক্ষ্য প্রদান (Witnesses)
ধারা ১১৮: সকল ব্যক্তিই সাক্ষ্য দিতে সক্ষম, যদি না সে আদালতকে বুঝতে বা যৌক্তিক উত্তর দিতে অক্ষম হয় (যেমন: অতিরিক্ত বয়স বা অসুস্থতা)।
ধারা ১১৯: বোবা সাক্ষী ইশারায় বা লিখে সাক্ষ্য দিতে পারেন, যা মৌখিক সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে।
ধারা ১২০: দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় মামলায় স্বামী-স্ত্রী একে অপরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারেন।
ধারা ১২১: বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেটকে তার বিচারিক আচরণ সম্পর্কে বিশেষ কারণ ছাড়া সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।
ধারা ১২২: বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার গোপন আলাপচারিতা প্রকাশ করতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না।
ধারা ১২৩: রাষ্ট্রের কোনো গোপন নথিপত্র বা বিষয় সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ছাড়া সাক্ষ্য হিসেবে দেওয়া যাবে না।
ধারা ১২৪: সরকারি কর্মচারী তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রাপ্ত গোপন তথ্য প্রকাশে বাধ্য নন।
ধারা ১২৫: ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তা তার কাছে আসা অপরাধের খবর বা সোর্সের নাম প্রকাশে বাধ্য নন।
ধারা ১২৬: পেশাগত কারণে মক্কেল ও তার আইনজীবীর মধ্যে হওয়া গোপন আলোচনা বা পরামর্শ ফাঁস করা যাবে না।
ধারা ১২৭: ধারা ১২৬-এর সুরক্ষা দোভাষী, ক্লার্ক ও আইনজীবীর কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ধারা ১২৮: মক্কেল নিজে সাক্ষ্য দিলে তা আইনজীবীকে গোপন তথ্য ফাঁসের অনুমতি দেয় না।
ধারা ১২৯: আইনি উপদেষ্টার সাথে মক্কেলের কনফিডেনশিয়াল আলোচনা প্রকাশে বাধ্য করা যাবে না।
ধারা ১৩০: মামলার সাক্ষী নয় এমন কোনো ব্যক্তি তার জমির দলিল বা ডিক্রি আদালতে দেখাতে বাধ্য নন।
ধারা ১৩১: অন্য কোনো ব্যক্তির হয়ে দলিল দখলে রাখলে, মূল মালিকের অনুমতি ছাড়া তা আদালতে পেশ করতে বাধ্য নন।
ধারা ১৩২: প্রশ্নের উত্তর দিলে আসামী হয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও সাক্ষী উত্তর দিতে বাধ্য (তবে তা তার বিরদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না)।
ধারা ১৩৩: সহ-অপরাধী (Accomplice) একজন যোগ্য সাক্ষী এবং তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা অবৈধ নয়।
ধারা ১৩৪: মামলার প্রমাণের জন্য কতজন সাক্ষী লাগবে তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই; সাক্ষ্যের মানই মুখ্য।
সাক্ষী পরীক্ষা (Examination of Witnesses)
ধারা ১৩৫: আদালত সাক্ষীদের হাজির করা এবং পরীক্ষার ক্রম নির্ধারণ করবেন।
ধারা ১৩৬: কোনো সাক্ষ্য বা দলিল গ্রহণ করা হবে কি না তা বিচারক নির্ধারণ করবেন।
ধারা ১৩৭: সাক্ষীর জবানবন্দি (Examination-in-chief), জেরা (Cross-examination) এবং পুনরায় জবানবন্দির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ধারা ১৩৮: প্রথমে জবানবন্দি, তারপর জেরা এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় জবানবন্দি নিতে হবে।
ধারা ১৩৯: কেবল দলিল দাখিলের জন্য কাউকে তলব করলে তাকে জেরা করা যাবে না, যতক্ষণ না তাকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়।
ধারা ১৪০: চরিত্রের সাক্ষী বা সচ্চরিত্রের প্রমাণ দিতে আসা সাক্ষীকে জেরা করা যাবে।
ধারা ১৪১: ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading Question) বলতে এমন প্রশ্ন বোঝায় যার উত্তর প্রশ্নের মধ্যেই থাকে।
ধারা ১৪২: জবানবন্দি বা পুনরায় জবানবন্দির সময় আদালতের অনুমতি ছাড়া ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যাবে না।
ধারা ১৪৩: জেরার (Cross-examination) সময় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যায়।
ধারা ১৪৪: কোনো সাক্ষী লিখিত চুক্তি বা দলিলের বিষয়ে জবানবন্দি দিলে তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জেরা করা যেতে পারে।
ধারা ১৪৫: সাক্ষী অতীতে কোনো লিখিত বিবৃতি দিয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে তাকে জেরা করা যাবে।
ধারা ১৪৬: জেরার সময় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা বা তার অবস্থান যাচাই করতে বিভিন্ন প্রশ্ন করা যাবে।
ধারা ১৪৭: সাক্ষীকে যদি ধারা ১৪৬ অনুযায়ী প্রশ্ন করা হয়, তবে ধারা ১৩২ অনুযায়ী তাকে উত্তর দিতে বাধ্য করা যাবে।
ধারা ১৪৮: সাক্ষীর চরিত্রের ওপর প্রভাব ফেলে এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন গ্রহণ করা হবে কি না তা আদালত ঠিক করবেন।
ধারা ১৪৯: পর্যাপ্ত ভিত্তি বা প্রমাণ ছাড়া সাক্ষীর চরিত্রে আঘাত হানে এমন প্রশ্ন করা যাবে না।
ধারা ১৫০: কোনো উকিল যদি ভিত্তিহীন বা আজেবাজে প্রশ্ন করেন, তবে আদালত হাইকোর্ট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন।
এই ধারাগুলো মূলত আদালতের সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের দায়ভারের ভারসাম্য রক্ষা করে।
আপনার কি নির্দিষ্ট কোনো ধারা (যেমন: বিবন্ধ বা প্রমাণের দায়ভার) সম্পর্কে বিস্তারিত উদাহরণ প্রয়োজন?
Comments
Post a Comment