সাক্ষ্য আইনের ১ থেকে ১০০ ধারা পর্যন্ত
সাক্ষ্য আইনের ১ থেকে ১০০ ধারা পর্যন্ত বিষয়গুলো মূলত সাক্ষ্যের প্রাসঙ্গিকতা এবং দলিল সংক্রান্ত বিধান নিয়ে আলোচনা করে। নিচে এর সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
প্রাথমিক ও প্রাসঙ্গিকতা (ধারা ১-৫৫)
ধারা ১: এই আইন সমগ্র বাংলাদেশের সকল আদালত ও সামরিক আদালতের জন্য প্রযোজ্য (হলফনামা ও সালিশি ছাড়া)।
ধারা ৩: মামলার গুরুত্বপূর্ণ শব্দাবলি যেমন— 'আদালত', 'ঘটনা', 'প্রাসঙ্গিক', 'সাক্ষ্য' এবং 'প্রমাণিত'-এর সংজ্ঞা।
ধারা ৫: বিচার্য বিষয় এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না।
ধারা ৬ (Res Gestae): একই ঘটনার অংশ হিসেবে ঘটা বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক (যেমন: ঘটনার সময় চিৎকার)।
ধারা ৭: ঘটনার উপলক্ষ, কারণ বা সুযোগ সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৮: মোটিভ (উদ্দেশ্য), প্রস্তুতি এবং পূর্ববর্তী বা পরবর্তী আচরণ প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৯: বিচার্য বিষয় ব্যাখ্যা বা পরিচয় (যেমন: শনাক্তকরণ মহড়া/T.I. Parade) করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাসঙ্গিক।
ধারা ১০: ষড়যন্ত্রকারীদের একজন সাধারণ উদ্দেশ্যে যা বলে বা করে, তা সবার বিরুদ্ধে প্রাসঙ্গিক।
ধারা ১১ (Alibi): যে তথ্য বিচার্য বিষয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ (যেমন: ঘটনার সময় আমি অন্য শহরে ছিলাম) তা প্রাসঙ্গিক।
ধারা ১৪: মনের অবস্থা (যেমন: ইচ্ছা, জ্ঞান, অবহেলা) বা শরীরের অনুভূতি প্রকাশক তথ্য প্রাসঙ্গিক।
ধারা ১৭: স্বীকৃতি (Admission) বলতে এমন মৌখিক বা লিখিত উক্তি বোঝায় যা বিচার্য বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়।
ধারা ২০: মামলার কোনো পক্ষ যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির তথ্যের ওপর নির্ভর করে, তবে ওই ব্যক্তির তথ্য স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে।
ধারা ২৩: দেওয়ানি মামলায় 'আপস-মীমাংসার শর্তে' দেওয়া কোনো স্বীকৃতি সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়া যাবে না।
ধারা ২৪: প্রলোভন, হুমকি বা ভীতি প্রদর্শন করে আদায় করা স্বীকারোক্তি (Confession) অপ্রাসঙ্গিক।
ধারা ২৫: পুলিশের কাছে দেওয়া কোনো স্বীকারোক্তি আসামীর বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যাবে না।
ধারা ২৬: পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে দেওয়া স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না তা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া হয়।
ধারা ২৭: আসামীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যতটুকু আলামত উদ্ধার হয়, শুধু ততটুকু অংশ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
ধারা ২৮: ভয় বা প্রলোভন দূর হওয়ার পর দেওয়া স্বীকারোক্তি প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৩০: যৌথ বিচারে এক আসামীর স্বীকারোক্তি অন্য সহ-আসামীর বিরুদ্ধে আদালত বিবেচনা করতে পারেন।
ধারা ৩২: মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন এমন ব্যক্তির বক্তব্য প্রাসঙ্গিক (যেমন: মৃত্যুকালীন জবানবন্দি)।
ধারা ৩৩: আগের কোনো বিচারিক কার্যক্রমে দেওয়া সাক্ষ্য পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যায় যদি সাক্ষী মারা যান।
ধারা ৩৪: হিসাবের খাতা বা ডায়েরির নিয়মিত এন্ট্রি প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৪৫: বিশেষজ্ঞের (হাতের লেখা, আঙুলের ছাপ, ডাক্তার) মতামত প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৪৭: কারো হাতের লেখা সম্পর্কে পরিচিত ব্যক্তির মতামত প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৫০: আত্মীয়তা বা সম্পর্কের (যেমন: স্বামী-স্ত্রী) বিষয়ে পরিচিত মানুষের মতামত প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৫২: দেওয়ানি মামলায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অপ্রাসঙ্গিক।
ধারা ৫৩: ফৌজদারি মামলায় আসামীর ভালো চরিত্র প্রাসঙ্গিক।
ধারা ৫৪: আসামী সচ্চরিত্রের প্রমাণ না দিলে তার খারাপ চরিত্র অপ্রাসঙ্গিক (ব্যতিক্রম ছাড়া)।
প্রমাণের প্রয়োজন নেই ও মৌখিক সাক্ষ্য (ধারা ৫৬-৬০)
ধারা ৫৬: যে বিষয় আদালত বিচার বিভাগীয় নোটিশে নিতে পারেন (Judicial Notice), তা প্রমাণের দরকার নেই।
ধারা ৫৭: আদালত যেসব বিষয় অবশ্যই অবগত থাকবেন (যেমন: বাংলাদেশের মানচিত্র, আইন, গেজেট)।
ধারা ৫৮: মামলার পক্ষগুলো যে বিষয় স্বীকার করে নিয়েছে, তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
ধারা ৫৯: দলিলের বিষয়বস্তু ছাড়া অন্য সব বিষয় মৌখিক সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করা যায়।
ধারা ৬০: মৌখিক সাক্ষ্য অবশ্যই প্রত্যক্ষ (Direct) হতে হবে; শোনা কথা (Hearsay) সাক্ষ্য নয়।
দালিলিক সাক্ষ্য (ধারা ৬১-১০০)
ধারা ৬১: দলিলের বিষয়বস্তু প্রাথমিক বা গৌণ সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।
ধারা ৬২: প্রাথমিক সাক্ষ্য (Primary Evidence) মানে হলো মূল দলিলটিই আদালতে পেশ করা।
ধারা ৬৩: গৌণ সাক্ষ্য (Secondary Evidence) মানে হলো ফটোকপি, সার্টিফাইড কপি বা মূল দলিলের বর্ণনা।
ধারা ৬৫: কখন মূল দলিলের পরিবর্তে ফটোকপি বা গৌণ সাক্ষ্য দেওয়া যাবে তার শর্তাবলি।
ধারা ৬৭: দলিলে কারো স্বাক্ষর বা হাতের লেখা প্রমাণের নিয়ম।
ধারা ৬৮: যে দলিল আইনত প্রত্যায়ন (Attest) করা দরকার (যেমন: উইল), তা প্রমাণের জন্য অন্তত একজন সাক্ষী ডাকতে হবে।
ধারা ৭৩: আদালতের সামনে থাকা অন্য কোনো লেখার সাথে সন্দেহজনক স্বাক্ষর বা লেখা মিলিয়ে দেখা।
ধারা ৭৪: সরকারি দলিল (Public Document) যেমন— আদালতের রেকর্ড, সরকারি গেজেট।
ধারা ৭৫: সরকারি দলিল ছাড়া বাকি সব ব্যক্তিগত দলিল (Private Document)।
ধারা ৭৬: সরকারি দলিলের সার্টিফাইড কপি প্রদানের নিয়ম।
ধারা ৭৯-৯০: বিভিন্ন দলিলের সত্যতা সম্পর্কে আদালতের অনুমান (যেমন: ৩০ বছরের পুরনো দলিল সঠিক বলে আদালত ধরে নিতে পারেন)।
ধারা ৯১: কোনো চুক্তি বা লেনদেন লিখিত হয়ে থাকলে তার প্রমাণ হিসেবে শুধু ওই দলিলটিই দিতে হবে।
ধারা ৯২: লিখিত দলিলের শর্ত পরিবর্তন বা অস্বীকার করার জন্য কোনো মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না।
ধারা ৯৩: দলিলে যদি এমন অস্পষ্টতা থাকে যা পড়েই বোঝা যায় না (Patent Ambiguity), তবে তা প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না।
সাক্ষ্য আইনের এই প্রথম ১০০টি ধারা মূলত নির্ধারণ করে কোন কথাগুলো আদালত শুনবেন এবং কোন কাগজগুলো আদালত গ্রহণ করবেন।
আপনার কি এর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপ (যেমন: স্বীকারোক্তি বা দলিল) নিয়ে বাস্তব উদাহরণসহ ব্যাখ্যা লাগবে?
Comments
Post a Comment