আন্তর্জাতিক আইনের পটভূমি, আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন উৎস:
আন্তর্জাতিক আইনের পটভূমি:
বর্তমান বিশ্বে কোন রাষ্ট্রই স্বয়ংসম্পূর্ণ বা আত্মনির্ভরশীল নয়। প্রতিটি রাষ্ট্রই অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থনীতিক রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি বহুবিধ পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে এই পারস্পরিক সম্পর্ক অবাধ হতে পারে না। ল্যাস্কির মতানুসারে বর্তমানে রাষ্ট্রগুলি পরস্পরের উপর এত বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে, কোন রাষ্ট্র অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হলে তা অন্যান্য রাষ্ট্রের শান্তির পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। তিনি বলেছেন: “The world has become so interdependent that an unfettered will in any State is fatal to the peace of other States." তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। এই প্রয়োজনের তাগিদেই আন্তর্জাতিক আইনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা:
যে সকল নিয়মকানুন সভ্য রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণভাবে সেগুলিকেই আন্তর্জাতিক আইন বলে। লরেন্স বলেছেন: “The rules which determines the conduct of the general body of civilised state in their mutual dealings." fe রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সকল স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী প্রচলিত তাই আন্তর্জাতিক আইন হিসাবে পরিগণিত হয়। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইনবিদ ওপেনহেইম (Oppenheim) ও অনুরূপ মত পোষণ করেন। তাঁর মতে "(International law is the body of customary and conventional rules which are considered legally binding by civilised states in their inter-course with each other." ফেন্উইকের মতে, 'আন্তর্জাতিক আইন হল সেই সমস্ত সাধারণ নীতি এবং নির্দিষ্ট নিয়মের সমষ্টি যা আন্তর্জাতিক সমাজের সদস্যগণ তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেনে চলে” (“The body of general principles and specific rules which are binding upon the international community in their mutual relations.")। ব্রিয়ারলির মতানুসারে, যে সকল নিয়ম ও মূল নীতি সভ্য রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলা হয়, তাই হল আন্তর্জাতিক আইন ("The body of rules and principles of action which are binding upon civilised states in their relation with one another.")। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রসমূহের অধিকার, এই অধিকার রক্ষার ব্যবস্থাদি এবং অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তার প্রতিবিধানের উপায় প্রভৃতি সম্পর্কে নির্দেশ উল্লিখিত থাকে।
আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন উৎস:
আন্তর্জাতিক আইনের উৎস প্রসঙ্গে আইনবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনের উৎস হিসাবে রাষ্ট্রসমূহের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদ্ভূত বিভিন্ন ব্যবহারিক প্রথা, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সন্ধি ও চুক্তিসমূহ, আন্তর্জাতিক সংগঠনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক আদালতের বিধান (Statute)-এর ৩৮ ধারা অনুসারে আন্তর্জাতিক আইনের নিম্নলিখিত উৎসগুলির কথা বলা হয়। (ক) বিবদমান রাষ্ট্রগুলি কর্তৃক স্বীকৃত এবং সাধারণ বা বিশেষ আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট নিয়মাবলী; (খ) আন্তর্জাতিক প্রথাসমূহ যা আইনের মত বাধ্যতামূলকভাবে স্বীকৃত। (গ) সভ্য রাষ্ট্রসমূহের দ্বারা স্বীকৃত আইনের সাধারণ নিয়মসমূহ; (ঘ) বিশিষ্ট আইনবিদদের বিভিন্ন পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা এবং (ঙ) আদালতের সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া রাষ্ট্রপ্রধান এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মতামতও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রথা ও রীতিনীতি সৃষ্টিতে সাহায্য করে থাকে। তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনের উৎস হিসাবে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ-আয়োজনকে স্বীকার করা হয়।
Comments
Post a Comment